সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের কাজ এখনো প্রস্তাবনা ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সরকার ইতিবাচক অবস্থান জানালেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে এটি বাস্তবায়ন কিছুটা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, নবম পে স্কেল কার্যকর করার বিষয়ে সরকারের নীতিগত সমর্থন রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি; বিশেষ করে ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা ঘিরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বিষয়টি বাস্তবায়নে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সরকার। এ পরিস্থিতিতে ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকেই ঝুঁকছে সরকার। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীরা দ্রুত নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন ও বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবি জানিয়ে আসছেন।
এদিকে পে স্কেল সংক্রান্ত প্রস্তাব পুনরায় পর্যালোচনার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনে আলোচনা হতে পারে। ইতোমধ্যে সংসদের কার্যপ্রণালি প্রণয়নের প্রস্তুতিও চলছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন কাঠামোটি ধাপে ধাপে হলেও কার্যকর করা হতে পারে। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই সময় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগোতে চায় সরকার।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান এবং পে কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান। সরকারি সূচিতে তিনি পিকেএসএফ চেয়ারম্যান হিসেবে সাক্ষাৎ করলেও বৈঠকে পে কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পে স্কেল সংক্রান্ত সুপারিশগুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেখতে হবে মোট অ্যামাউন্ট কত। এটা কতটুকু বাস্তবায়ন করা সম্ভব সেগুলো দেখতে হবে। বর্তমান আর্থিক অবস্থায় যেখানে বাংলাদেশের ট্যাক্স রেভিনিউ, ট্যাক্স জিডিপি রেশিও সবচেয়ে খারাপ, এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতে সবচেয়ে খারাপ। এসব দেখে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কতটুকু কখন কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। সেটা আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব।’
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছর ২০২৬–২৭ থেকে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের একটি প্রস্তাব রয়েছে। তবে বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না। কারণ বর্তমানে সরকারের আর্থিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও পুরোপুরি কমেনি। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় না, যাতে সরকারি চাকরিজীবীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। এজন্য প্রস্তাবিত পে স্কেল পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়েই রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এ সংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের জন্য আগে একটি কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে আর্থিক সংকটের কারণে নির্বাচনের আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার এটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
পে কমিশন ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশসহ তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। যদিও সেটি পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন বাজেট প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসবে।
দায়িত্ব ছাড়ার আগে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদন বাস্তবসম্মত এবং এটি বাস্তবায়নের বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনো পে স্কেল বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে সামনে জাতীয় সংসদের অধিবেশন থাকায় বিষয়টি সেখানে আলোচনায় আসতে পারে বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে ২১ সদস্যের একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব ও পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে কমিশনের প্রধান করা হয়। কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দেয়।
খুলনা গেজেট/এএজে

